গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - টমেটো চাষ পদ্ধতি

গর্ভাবস্থায় কি কি সবজি খাওয়া যাবে না তা জানুনসুপ্রিয় পাঠক, গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - টমেটো চাষ পদ্ধতি এবং টমেটোর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - টমেটো চাষ পদ্ধতি
এই আর্টিকেলে গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা, টমেটো চাষ পদ্ধতি, টমেটোর পুষ্টিগুণ, সহ টমেটোর সকল বিষয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি টমেটো খাওয়ার ফলে আপনার দেহের কোন কোন সমস্যার সমাধান হবে সেই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
সূচিপত্রঃ গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - টমেটো চাষ পদ্ধতি

টমেটো

টমেটো এক ধরনের ভোজ্য রসালো ফল। টমেটোর উৎপত্তি হয়েছে পশ্চিমা-দক্ষিণ আমেরিকা এবং মধ্য আমেরিকায়। টমেটো সাধারণত ফল ও সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। টমেটো কাঁচা খাওয়া হয় এবং রান্না করেও খাওয়া হয়। কাঁচা অবস্থায় টমেটোর রং সবুজ থাকে এবং পাকলে তা লাল রং ধারণ করে। টমেটোতে বিশেষ খাদ্য উপাদান থাকার কারণে মানুষ কাঁচা অবস্থায় টমেটোকে সালাদ হিসাবে বেশি পছন্দ করে। তাছাড়া বর্তমান সময়ে টমেটো সস অনেক জনপ্রিয় একটি খাবার সবার কাছে।

টমেটো চাষ পদ্ধতি

আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্তমান সময়ে বাণিজ্যিকভাবে টমেটো চাষ করা হচ্ছে। খুব অল্প সময়ে টমেটোর ভালো ফলন পাওয়া যায় বলে অনেক উদ্যোক্তা টমেটো চাষের দিকে আগ্রহ প্রকাশ করছে। কিন্তু হয়তো আমরা অনেকেই টমেটো চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন সঠিক তথ্য জানিনা যার ফলে খুব ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হয় না। চলুন জেনে নেওয়া যাক আধুনিক উপায়ে টমেটো চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে,
  • চারা তৈরি
সরাসরি টমেটোর বীজ জমিতে বুনেও টমেটো চাষ করা যায় এবং আলাদাভাবে চারা রোপণ করেও টমেটো চাষ করা সম্ভব। তবে ভালো হবে যদি আপনি টমেটোর চারা রোপন করে টমেটো চাষ করেন তবে। টমেটো চারা রোপন করার জন্য রোদযুক্ত উঁচু জমির প্রয়োজন। তারপর সেই জমি ভালো করে চারা রোপনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে এবং মাটি সমতল করে ১ মিটার চওড়া বেড বানাতে হবে।
টমেটোর বীজ বীজ তলায় বপন করতে হবে পাশাপাশি পরিচর্যা করতে হবে নিয়মিত। বীজ বপণের ৭-১৪ দিনের মধ্যে চারা গজাবে। আপনি যদি শীতকালীন টমেটো চাষ করতে চান তাহলে বাংলা মাসের কার্তিক- অগ্রহায়ণ পর্যন্ত বীজ বুনে চারা রোপণ করতে পারবেন।
  • জমি তৈরি
প্রথমে আপনাকে উর্বর জমি চিহ্নিত করতে হবে তারপর জমিতে ৩-৪ বার চাষ ও মই দিয়ে জমি পুরা ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। আপনি যদি গ্রীষ্মকালে টমেটো চাষ করতে চান তাহলে ১৫-২০ সে.মি উঁচু এবং ২২০ সে.মি চওড়া বেড তৈরি করে নিতে হবে যাতে করে পানি সেচ দিতে কোন সমস্যা না হয় সেই রকম ভাবে নালা তৈরি করে নিতে হবে।
  • চারা রোপন
২০-২৫ দিন বয়সের চারা প্রতি বেডের ২ সারিতে রোপন করতে হবে খেয়াল রাখতে হবে এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব হয় কমপক্ষে ৫০ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৩০-৩৫ সে.মি। প্রতি শতক জমিতে ১৮০-২০০ টির মত চারা লাগানো যায়।
  • চারা রোপণের সময়
শীতকালীন টমেটোর জন্য চারা রোপনের উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর থেকে জানুয়ারি (কার্তিক থেকে মাঘ) পর্যন্ত। তবে আগাম চাষের জন্য আপনি চাইলে এর আগেও চারা রোপণ করতে পারেন। আবার গ্রীষ্মকালীন সময় টমেটো চাষের জন্য চারা রোপনের উপযুক্ত সময় হল মার্চ থেকে এপ্রিল (চৈত্রথেকে বৈশাখ) পর্যন্ত।
  • নিয়মিত পরিচর্যা
টমেটোর ভালো ফলের পাওয়ার জন্য অবশ্যই আপনাকে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। কেননা আপনি যদি গ্রীষ্মকালীন সময়ে টমেটো চাষ করেন তাহলে অবশ্যই নিয়মিত সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। অপরপক্ষে শীতকালীন সময়ে টমেটো চাষ করলে অতিরিক্ত কুয়াশা যাতে টমেটো গাছের কোন ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

পাশাপাশি টমেটো চারা রোপনের পর জমির চারিদিকে ভালোভাবে বেড়া দিয়ে রাখতে হবে যাতে কোন গবাদি পশু টমেটো চারা খেতে না পারে বা নষ্ট করতে না পারে। পাশাপাশি রোগ বালাই নিরাময় করার জন্য নিয়মিত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
  • সার প্রয়োগ
জমি চাষের পূর্বে আপনাকে অবশ্যই গোবর ও টিএসপি সার দিয়ে তারপর জমি চাষ করতে হবে। তারপর চারা লাগানোর পূর্বে কিছুটা গোবর জমির বিভিন্ন জায়গায় গর্ত করে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর চারা রোপনের ৩য় এবং ৫ম সপ্তাহে রিং পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। কোন কিছুর ঘাটতি থাকলে জিংক, সালফেট, জিপসাম, বোরিক অ্যাসিড পাউডার, ম্যাগনেসিয়াম এবং জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে টমেটোর বাম্পার ফলন পেতে চাইলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা সহায়তা নিতে পারেন।
  • পোকা ও রোগ দমন
টমেটো গাছের রস শোষণ করে থাকে জাবপোকা এবং শোষক পোকা। জাবপোকা দমনের জন্য এফিডান ডাস্টিং ও এডমায়ার এবং শোষক পোকা দমনের জন্য সেভিন বা নেক্সিয়ন ও ম্যালাথিয়ন ব্যবহার করতে পারেন। টমেটো গাছের সবচাইতে বড় রোগ হলো ফিউজেরিয়াম উইল্ট যার কারণে টমেটো গাছের পাতা হলুদাভ হয় এবং পাতা বেঁকে যাই যার ফলে পুরো গাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং এই সমস্যা এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষ করে মাটি যদি বেশি স্যাঁতস্যাঁতে থাকে তাহলে এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়। সে কারণে আক্রান্ত গাছ খুব দ্রুত তুলে ফেলে অন্য জায়গায় পুতে দিতে হবে এবং পোকা ও রোগ দমন করতে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে।

টমেটোর পুষ্টিগুণ

টমেটো সারা বছর দেখা গেলেও শীত মৌসুমে একটু বেশি পাওয়া যায় সে কারণে হয়তো অনেকে টমেটোকে শীতকালীন সবজি বলে থাকে। টমেটোর মধ্যে অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে যেসব পুষ্টিগুণ আমাদের দেহের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। কাঁচা থেকে পাকা অবস্থায় টমেটোর পুষ্টিগুণ অনেকটা বেশি আর সেই পাকা টমেটোতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে যা আমাদের দাঁত এবং হাড় শক্ত করতে সাহায্য করে থাকে।
১০০ গ্রামের একটি পাকা টমেটোতে ৩০০ গ্রামেরও অধিক মাইক্রগ্রাম ক্যারোটিন রয়েছে আর ক্যারোটিন এমন একপ্রকারের ভিটামিন যা আমাদের সকলের দেহ গঠন করার জন্য আবশ্যক। কেননা ক্যারোটিনের কারণে মানুষের চোখের রেটিনা সুস্থ থাকে এবং দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়। তাছাড়া টমেটোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে যা আমাদের দাঁত এবং হাড় গঠন করতে সহায়তা করে থাকে। তাছাড়াও হৃৎপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, এবং পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে টমেটো। তাই নিজের শরীর সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত পাকা টমেটো খাওয়ার অভ্যাস করুন।

টমেটো খাওয়ার উপকারিতা

টমেটো মূলত শীতকালীন একটি ফল তবে বর্তমান সময়ে সারা বছরই টমেটো পাওয়া যায়। রান্নার স্বাদ বাড়াতে এবং সালাদ হিসেবে টমেটোর কোন বিকল্প নেই। তাছাড়াও টমেটো খাওয়ার উপকারিতা প্রচুর কেননা টমেটোতে নানান প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে যা মানুষের শরীর গঠন করার জন্য অত্যন্ত জরুরী। টমেটোতে রয়েছে ভিটামিনের সকল বৈশিষ্ট্য পাশাপাশি আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, কোলিন, কপার এবং ফসফরাস তাছাড়া ও রয়েছে খনিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

চলুন জেনে নেওয়া যাক নিয়মিত টমেটো খাওয়ার উপকারিতা এবং কোন কোন সমস্যার সমাধানে আপনি টমেটো খেতে পারেন সেই সম্পর্কে,
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে
যাদের শরীর খুব অল্পতেই দুর্বল মনে হয় তারা নিয়মিত টমেটো খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কারণ টমেটো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি ফল যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্ট্রেস হরমোন কমায় যার কারণে শরীর কম অসুস্থ হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে।
  • রক্তশূন্যতা দূর করে
টমেটো খাওয়ার উপকারিতা যত রয়েছে তার মধ্যে সবচাইতে ভালো কাজ হয় দেহের রক্তশূন্যতা দূর করতে। নিয়মিত টমেটো খাওয়ার ফলে রক্তের কণিকা বৃদ্ধি পায় যার জন্য দেহের রক্তশূন্যতা দূর হয় তাছাড়াও রক্ত পরিষ্কার করতে টমেটোর কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি যাদের বদহজমের সমস্যা রয়েছে বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে তারা চাইলে প্রতিদিন ২-৩ পাকা টমেটো খেতে পারেন।
  • কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে
টমেটোতে থাকা সমস্ত ভিটামিনের উপাদান এবং পটাশিয়াম কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে থাকে। যাদের উচ্চ রক্ত চাপের সমস্যা রয়েছে তারা নিয়মিত টমেটো খেতে পারেন, তবে অতিরিক্ত টমেটো খেলে রক্ত চাপ বেড়ে প্রেসারের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
যেসব মানুষের ডায়াবেটিসের সমস্যা আসে তারা নিয়মিত টমেটো খাওয়ার অভ্যাস করুন কারণ টমেটো খাওয়ার উপকারিতা অনেক যা আপনার দেহের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। টমেটোতে ক্রোমিয়াম নামক খনিজ উপাদান থাকার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে যার ফলে মানুষের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • ত্বকের যত্নে
টমেটোতে থাকা লাইকোপিন ত্বকের ক্লিনজার হিসাবে কাজ করে থাকে যার ফলে ত্বক পরিষ্কার থাকে ও সুন্দর লাগে। তবে যাদের ত্বকে ডার্ক-সার্কেলের দাগ রয়েছে চাইলে টমেটো খাওয়ার পাশাপাশি পাকা টমেটোর রস সেখানে ব্যবহার করতে পারে। সেজন্য নিজের ত্বক সুন্দর ও মসৃণ রাখার জন্য নিয়মিত টমেটো খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা

গর্ভবতী মহিলাদের জন্য টমেটো খাওয়া নিরাপদ তবে অবশ্যই সেটা পরিমাণমতো খেতে হবে। কারণ টমেটোতে থাকা ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ফোলেট, আইরন ও লাইকোপিন দ্বারা গর্ভবতী মহিলা এবং গর্বের শিশু অনেক উপকৃত হবে। কারণ ভিটামিন-সি গর্ভবতী মহিলাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আয়রনের শোষণকে উন্নত করতে কাজ করে থাকে যার ফলে গর্ভের শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ঘটে খুব দ্রুত।

গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা আরো অনেক রয়েছে, বিশেষ করে একটি টমেটোতে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে যা গর্ভবতী মহিলার শরীরের পানি শূন্যতা দূর করতে কাজ করে থাকে। সেজন্য গর্ভবতী মহিলাদের কাঁচা ফলমূলের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের সবজি খাওয়াতে হবে। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে টমেটো খাওয়া থেকে গর্ভবতী মহিলাদের বিরত থাকতে হবে প্রয়োজনে গর্ভবতী মহিলার খাবারের চার্ট তৈরির পূর্বে রেজিস্টার ডক্টরের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা

আর.বি.আর ব্লগের এই আর্টিকেলে গর্ভাবস্থায় টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - টমেটো চাষ পদ্ধতি এবং টমেটোর পুষ্টিগুণ সহ টমেটোর সকল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আর্টিকেলটি ভালো লেগে থাকলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন। যেকোনো বিষয়ের আপডেট তথ্য সবার আগে জানতে আর.বি.আর ব্লগের গুগল নিউজে ফলো দিয়ে রাখুন। আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url